রবি. মে ৯, ২০২১

Fortune News 24

ফরচুন নিউজ ২৪

 ছাদ ও অল্প জমির জন্য বারোমাসি জাতের লাউ উদ্ভাবন

১ মিনিট পাঠের সময়

শীত মানেই তাপমাত্রার ওঠানামা। সঙ্গে নানাবিধ জীবাণুর দাপাদাপি তো রয়েছেই। ফলে নানা রোগের আক্রমণে শরীর ভাঙতে সময় লাগে না। আর এমন পরিস্থিতিতে শরীরকে নানা রোগের মার থেকে বাঁচিয়ে রাখতে লাউয়ের কোনও বিকল্প হয় না বললেই চলে। গবেষণা বলছে, লাউয়ের ভিতরে মজুত রয়েছে প্রচুর মাত্রায় ভিটামিন সি, বি এবং ডি, সেই সঙ্গে ক্যালসিয়াম, সোডিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, ফোলেট, আয়রন এবং পটাশিয়াম, যা নানাবিধ রোগের হাত থেকে শরীরকে সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। সেই সঙ্গে আরও নানা উপকারে লাগে শরীরের। যেমন ধরুন-

ওজন কমে চোখে পরার মতো

বেশ কিছু স্টাডিতে দেখা গেছে, যে কোনও ভাবেই হোক, তা তরকারি বানিয়ে অথবা রস হিসেবে, লাউ খাওয়া শুরু করলে শরীরে ফাইবারের মাত্রা বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। ফলে খিদে কমে যায়। সেই সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কমে খাওয়ার পরিমাণও। আর কম খেলে ওজন যে দ্রুত কমে, তা কি আর বলাপ অপেক্ষা রাখে।

স্ট্রেস লেভেল কমে চোখের পলকে

লাউয়ে রয়েছে কোলন নামক এক ধরনের নিউরো ট্রান্সমিটার, যা শরীরে প্রবেশ করা মাত্র মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতাকে বাড়িয়ে তোলে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই স্ট্রেস লেভেল তো কমেই। সেই সঙ্গে ডিপ্রেশনসহ একাধিক মেন্টাল ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও যায় কমে। প্রসঙ্গত, গত কয়েক দশকে মানসিক চাপ এবং অ্যাংজাইটির কারণে নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা চোখে পরার মতো বৃদ্ধি পেয়েছে। এতাই তো রোজের ডায়েটে লাউকে রাখার প্রয়োজনও যে বেড়েছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

কনস্টিপেশন এবং নানাবিধ পেটের রোগের প্রকোপ কমে

অনিয়ন্ত্রিত খাওয়া-দাওয়ার কারণে বদ হজম এবং গ্যাস-অম্বল তো বাঙালির রোজের সঙ্গী। তার উপর কনস্টিপেশনের মতো সমস্যা তো আছেই। এমন পরিস্থিতিতে পেটকে চাঙ্গা করে তুলতে লাউয়ের কোনও বিকল্প হয় না বললেই চলে। কারণ এই সবজিটিতে রয়েছে প্রচুর মাত্রায় পানি এবং ফাইবার, যা হজম ক্ষমতার উন্নতি তো ঘটায়ই, সেই সঙ্গে কনস্টিপেশনের মতো রোগের প্রকোপ কমাতেও বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে।

শরীরে পানির অভাব দেখা দেওয়ার আশঙ্কা কমে

শরীরকে চাঙ্গা রাখতে পানির কোনও বিকল্প হয় না বললেই চলে। কারণ দীর্ঘক্ষণ ধরে শরীর তার প্রয়োজনীয় পানি না পেলে দেখা দেয় নানা রকমের রোগ। তাই তো দেহের ভিতরে যাতে পানির ঘাটতি দেখা না দেয়, সেদিকে খেয়াল রাখাটা আমাদের একান্ত প্রয়োজন। আর ঠিক এই কারণেই ভাতের পাতে লাউ থাকা মাস্ট! আসলে এই সবজিটিতে রয়েছে প্রচুর মাত্রায় পানি, যা দেহের ভিতরে পানির অভাব মেটাতে যেমন বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে, তেমনি ডিহাইড্রেশনের মতো সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও যায় কমে।

ব্লাড প্রেসার নিয়ন্ত্রণে থাকে

উচ্চ রক্তচাপের মতো সমস্যা যারা ভুগছেন তাদের ডায়েটে লাউ দিয়ে তৈরি কোনও না কোনও পদ থাকা বেজায় জরুরি! কারণ এতে রয়েছে এমন কিছু পুষ্টিকর উপাদান, যা রক্তচাপকে স্বাভাবিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। আর রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকলে হার্টের স্বাস্থ্যও ভাল হয়ে ওঠে। আর হার্ট যখন চাঙ্গা হয়ে ওঠে তখন সার্বিকভাবে আয়ুও যে বৃদ্ধি পায়, তা কি আর বলার অপেক্ষা রাখে।

ইনসমনিয়ার মতো রোগ দূরে পালায়

বেশ কিছু স্টাডিতে দেখা গেছে, রাতের খাদ্যাভ্যাসের কারণে সিংহভাগ বাঙালিরই ঠিক মতো ঘুম হয় না। ফলের দিনের পর দিন এমনটা হওয়ার কারণে স্বাভাবিকভাবেই ইনসমনিয়া বা অনিদ্রার মতো সমস্যা ঘারে চেপে বসে। তাই আপনিও যদি এমন রোগে আক্রান্ত হতে না চান, তাহলে লাউয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাতে দেরি করবেন না যেন! কারণ একাধিক গবেষণায় এ কথা প্রমাণিত হয়ে গেছে, নিয়মিত লাউ খাওয়া শুরু করলে, বিশেষত লাউয়ের রস, অনিদ্রার সমস্যা দূর হয়। ফলে বিনিদ্র রাত্রি যাপনের আশঙ্কা আর থাকে না বললেই চলে।

ত্বকের সৌন্দর্য বাড়ে চোখে পরার মতো

লাউয়ে উপস্থিত বিশেষ কিছু উপাদান শরীরে প্রবেশ করে এমন খেল দেখায় যে ত্বক ভিতর থেকে স্বাস্থ্যকর হয়ে ওঠে। ফলে সৌন্দর্য তো বাড়েই। সেই সঙ্গে তৈলাক্ত ত্বকের সমস্যাও নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। এই কারণেই তো প্রতিদিন লাউয়ের রস বা এই সবজিটি দিয়ে তৈরি কোনও না কোনও পদ খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে। প্রসঙ্গত, লাউ খাওয়া শুরু করলে আরও বেশ কিছু উপকার মেলে। যেমন ধরুন মাত্রতিরিক্ত ঘাম হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। সেই সঙ্গে ব্রণের মতো ত্বকের রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও আর থাকে না।

শরীর ঠাণ্ডা করে

অনেক সময়ই শরীরের ভিতরের তাপমাত্রা বেশ বেড়ে যায়, যা একেবারেই ভাল নয়। তাই তো সপ্তাহে ২-৩ দিন নিয়মিত লাউয়ের রস খাওয়া উচিত! আসলে এই সবজিটিতে যেমন রয়েছে প্রচুর মাত্রায় পানি, তেমনি রয়েছে প্রচুর পরিমাণ খনিজও, যা শরীরকে ঠাণ্ডা রাখার পাশাপাশি দেহের ভিতরে উপস্থিত ক্ষতিকর টক্সিক উপাদানদেরও বার করে দেয়। ফলে নানাবিধ রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কমে। তেমনি দেহের ভিতরে তাপমাত্রা বা প্রাদাহ বাড়ার সম্ভাবনাও আর থাকে না।

লাউ এরই মধ্যে চাষিদের মাঝে আশা জাগিয়েছে। দেশের সবজির সংকট মোকাবেলায়  গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত বারোমাসি এ জাত ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করছেন গবেষকরা।

সারা বছরই ফলন হওয়া স্বাদে দারুণ এ লাউ উদ্ভাবনের পেছনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এ কে এম আমিনুল ইসলামের আট বছরের সাধনা রয়েছে।

দীর্ঘ গবেষণার পর লাউয়ের দুইটি জাত সৃষ্টি করেন তিনি। নতুন এ জাত দুইটির নাম দেওয়া হয়েছে- বিইউ হাইব্রিড লাউ-১ ও বিইউ লাউ-১।

এ লাউ গাছের গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত প্রতিটি গিঁটে গিঁটে ফলন হয়। শুধু ফলনই নয়, এ জাত সৃষ্টিতে ভোক্তার কথাও ভাবা হয়েছে। পরিবারে লোক সংখ্যা কমে আসায় একটা প্রচলিত বড় লাউ একবারে রান্না করা সম্ভব হয় না। ফলে রেখে দেওয়া লাউয়ের কাটা অংশর স্বাদ ও গুণ কমে যায়। নতুন জাতের লাউয়ের সাইজ ছোট, তাই এতে এমন সমস্যা এড়ানো সম্ভব বলছেন গবেষকরা।

যদিও স্মার্ট কৃষিতে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারের বিষয়টি জড়ানো, তবু গাজীপুরের এ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এ জাতের লাউকে ‘স্মার্ট কৃষির’ জন্য উপযোগী বলছেন।

উপাচার্য অধ্যাপক ড. গিয়াস উদ্দিন মিয়া বলেন, কম জায়গায় বেশি ফলন উপযোগী এ জাত দুটো বাড়ির উঠোন বা আঙ্গিনায় এমনকি ভবনের ছাদেও সফলভাবে চাষ করা যাবে।

“দরিদ্র জনগোষ্ঠী এ লাউ চাষ করে নিজের চাহিদা মিটিয়ে সারা বছর বাজারে বিক্রি করে স্বচ্ছল হতে পারেন।”

বেশি ফলনের সুস্বাদু লাউয়ের এসব জাতের উদ্ভাবক আমিনুল ইসলাম দাবি করেন, আধুনিক ও বাণিজ্যিক চাষাবাদে যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে আসবে বিইউ হাইব্রিড লাউ-১ ও বিইউ লাউ-১ জাত।

উচ্চফলনশীল লাউয়ের জাত দুইটির একটি হাইব্রিড, অন্যটি উন্মুক্ত পরাগায়িত (ওপি)। দুটিরই ফলনের তুলনায় অঙ্গজবৃদ্ধি খুব কম হওয়ায় ‘স্মার্ট কৃষির জন্য একেবারে লাগসই’ বলছেন তিনি।